ফিলিস্তিন এবং ইসরায়েলের ব্যাখ্যা | ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন যুদ্ধের ইতিহাস ব্যাখ্যা | Wisdom story bangla
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন যুদ্ধের ইতিহাস ব্যাখ্যা
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের ইতিহাস অত্যন্ত জটিল এবং এর শিকড় হাজার হাজার বছরের পুরনো ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে প্রোথিত।
এই ভূখণ্ডটি বিশ্বের তিনটি প্রধান ধর্মের—ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মের জন্য পবিত্র স্থান হওয়ায় এর গুরুত্ব বহুমাত্রিক।
ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলটি 'কেনান' নামে পরিচিত ছিল।
;ইহুদি ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী, ঈশ্বর এই ভূমিটি ইব্রাহিম (আব্রাহাম) এবং তার বংশধরদের দান করেছিলেন।
প্রায় ৩০০০ বছর আগে রাজা শৌল, দাউদ ও সোলায়মানের অধীনে এখানে বনি ইসরাইল বা হিব্রুদের রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
জেরুজালেমে প্রথম ও দ্বিতীয় টেম্পল নির্মাণের মাধ্যমে এটি ইহুদিদের প্রধান ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।
তবে এই অঞ্চল বিভিন্ন সময়ে অ্যাসিরীয়, ব্যাবিলনীয়, পারস্য, গ্রিক ও রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে শাসিত হয়েছে।
৭০ খ্রিস্টাব্দে রোমান সাম্রাজ্য এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে জুডিয়া (বর্তমান ফিলিস্তিন) প্রদেশের ইহুদি বিদ্রোহ দমন করে
এই ধ্বংসযজ্ঞের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ছিল ইহুদিদের পবিত্রতম স্থান, দ্বিতীয় টেম্পলের ধ্বংস। রোমান সৈন্যরা টেম্পলটি পুড়িয়ে দেয় এবং এর ভিত্তি ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট রাখেনি।
এই ঘটনার ফলশ্রুতিতে প্রায় দশ লক্ষেরও বেশি ইহুদিকে হত্যা করা হয় এবং প্রায় এক লক্ষ ইহুদিকে বন্দী করে দাস হিসেবে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
এবং বিপুল সংখ্যক ইহুদিকে তাদের ancestral homeland (পিতৃভূমি) থেকে বিতাড়িত করা হয়,
যা ইতিহাসে ইহুদি ডায়াস্পোরা বাพลัดถิ่น (বিচ্ছিন্ন বসবাস) নামে পরিচিত।
এই বিতাড়ন কোনো একক আদেশে ঘটেনি, বরং এটি ছিল একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অংশ যা যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং তার পরবর্তী রোমান নীতিমালার ফল।
ইহুদিদের স্মৃতি মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে রোমানরা জুডিয়া প্রদেশের নাম পরিবর্তন করে রাখে "সিরিয়া প্যালেস্টিনা"।
সপ্তম শতকে ইসলামের আগমনের পর এই অঞ্চলটি মুসলিম খেলাফতের অধীনে আসে।
জেরুজালেম ইসলামের তৃতীয় পবিত্র নগরী হিসেবে মর্যাদা লাভ করে।
পরবর্তী শতকগুলোতে এই ভূমি ক্রুসেডার ও মুসলিম শাসকদের মধ্যে একাধিকবার হাতবদল হয়।
১৫১৭ সাল থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৮) পর্যন্ত প্রায় ৪০০ বছর এই অঞ্চলটি তুর্কি উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল।
এই সময়ে এখানে আরবরাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী এবং তাদের পাশাপাশি একটি ক্ষুদ্র ইহুদি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ও শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করত।
উনিশ শতকের শেষের দিকে ইউরোপে ইহুদিবিদ্বেষ (Anti-Semitism) বাড়তে থাকলে থিওডোর হার্জেলের নেতৃত্বে 'জায়নবাদ' বা ইহুদি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূচনা হয়।
এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল ঐতিহাসিক মাতৃভূমিতে, অর্থাৎ ফিলিস্তিনে, একটি স্বাধীন ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।
এর ফলে ইউরোপ থেকে বহু ইহুদি ফিলিস্তিনে এসে বসতি স্থাপন শুরু করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনের পর ফিলিস্তিন ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে আসে, যা 'ব্রিটিশ ম্যান্ডেট' নামে পরিচিত।
১৯১৭ সালে, ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি "জাতীয় আবাসভূমি" (national home) প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয়।
এই ঘোষণার পর থেকে ফিলিস্তিনে ইহুদি অভিবাসন দ্রুত বাড়তে থাকে।
জার্মানি থেকে ইহুদিদের ফিলিস্তিনে যাওয়ার প্রধান কারণ ছিল নাৎসি জার্মানির দ্বারা তাদের ওপর চালানো নির্যাতন এবং হলোকাস্ট।
১৯৩৩ সালে অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসি পার্টি ক্ষমতায় আসার পর জার্মানিতে ইহুদিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন ও নীতি প্রণয়ন করা হয় এবং ইহুদিদের ওপর কঠোর নির্যাতন শুরু হয়।
তাদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তারা সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
এটি ছিল একটি অত্যন্ত জটিল ও বেদনাদায়ক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, যা ইহুদিদের অভিবাসনকে ব্যাপক হারে প্রভাবিত করেছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন নাৎসি জার্মানি ইউরোপজুড়ে ইহুদিদের ওপর যে গণহত্যা চালায়, তা ইতিহাসে হলোকাস্ট নামে পরিচিত।
প্রায় ৬০ লক্ষ ইহুদিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলেও হলোকাস্টের শিকার হওয়া হাজার হাজার ইহুদি ইউরোপে, বিশেষ করে জার্মানির বিভিন্ন ক্যাম্পে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় ছিল।
তাদের নিজ বাসভূমিতে ফিরে যাওয়া নিরাপদ ছিল না এবং ইউরোপে তাদের জন্য কোনো স্থায়ী সমাধানেরও পথ ছিল না।
এই বাস্তুচ্যুত ইহুদিরা (Displaced Persons) একটি নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছিল।
নাৎসিদের নিপীড়ন থেকে বাঁচতে হাজার হাজার জার্মান ইহুদি ফিলিস্তিনে পালিয়ে যায়।
এই পরিস্থিতিতে, জীবন ও জীবিকা বাঁচাতে অনেক ইহুদি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়।
তাদের মধ্যে অনেক ধনী ও শিক্ষিত ইহুদিও ছিলেন, যারা ফিলিস্তিনের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
শরণার্থী হিসেবে প্রবেশ করলেও ইহুদিরা শুধু বসতি স্থাপন করেই ক্ষান্ত হয়নি।
তারা নিজেদের অবস্থান মজবুত করার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে।
ফিলিস্তিনের স্থানীয় আরব ভূস্বামীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ জমি ক্রয় করতে থাকে।
অনেক ক্ষেত্রে এই ভূস্বামীরা ফিলিস্তিনের বাইরে থাকতেন।
ইহুদি বসতিগুলো সুরক্ষার জন্য তারা হাগানা (Haganah)-এর মতো আধা-সামরিক বাহিনী গঠন করে।
১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে আরব ও ইহুদিদের মধ্যে ভাগ করার প্রস্তাব দেয়।
এই প্রস্তাব অনুযায়ী, ইহুদিরা মোট জনসংখ্যার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ হলেও, তারা প্রায় ৫৫ শতাংশ ভূমি পাওয়ার কথা ছিল। আরবরা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
উনিশ শতকের শেষের দিকে জায়নবাদী আন্দোলন শুরু হয়, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।
এই আন্দোলনের নেতারা সারা বিশ্বের ইহুদিদের ফিলিস্তিনে অভিবাসনের জন্য উৎসাহিত করেন।
১৯৪৮ সালের ১৪ মে ব্রিটিশরা ফিলিস্তিন ছেড়ে চলে যাওয়ার পরপরই ইসরায়েল রাষ্ট্রের ঘোষণা দেওয়া হয়।
এর জবাবে মিশর, জর্ডান, সিরিয়া, লেবানন এবং ইরাকসহ কয়েকটি আরব দেশ ইসরায়েল আক্রমণ করে।
পরে হাগানা (Haganah)-এর মতো আধা-সামরিক বাহিনীগুলোই আরও শক্তিশালী হয় এবং ইসরায়েলের নিয়মিত সেনাবাহিনী হিসেবে কাজ করে।
যুদ্ধের সময় ইহুদি বাহিনীগুলো ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ ও উচ্ছেদ অভিযান চালায়।
এই সময়ে প্রায় সাড়ে সাত লক্ষ ফিলিস্তিনি আরব তাদের ভিটেমাটি থেকে বিতাড়িত বা বাস্তুচ্যুত হয়, যা ফিলিস্তিনিদের কাছে 'নাকবা' বা মহাবিপর্যয় হিসেবে পরিচিত।
এই যুদ্ধে ইসরায়েল সামরিকভাবে জয়ী হয় এবং জাতিসংঘ প্রস্তাবিত সীমানার চেয়েও বেশি জায়গা দখল করে নেয়।
এভাবেই জার্মানি থেকে আসা ইহুদি শরণার্থীদের একটি অংশ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির মাধ্যমে ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে।
এরপর থেকে আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে বেশ কয়েকটি বড় যুদ্ধ হয়েছে।
এর মধ্যে ১৯৬৭ সালের 'ছয় দিনের যুদ্ধ' সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এই যুদ্ধে ইসরায়েল মিশর থেকে গাজা উপত্যকা ও সিনাই উপদ্বীপ, জর্ডানের কাছ থেকে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম এবং সিরিয়ার কাছ থেকে গোলান মালভূমি দখল করে নেয়।
এই দখলদারিত্বই বর্তমান সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু।
ফিলিস্তিনিদের অধিকার আদায়ের জন্য ১৯৬৪ সালে 'প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন' (PLO) গঠিত হয়।
ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের দুটি বড় গণঅভ্যুত্থান বা 'ইন্তিফাদা' (১৯৮৭-১৯৯৩ এবং ২০০০-২০০৫) সংঘটিত হয়।
১৯৯৩ সালে 'অসলো চুক্তি'র মাধ্যমে একটি শান্তি প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল এবং 'ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ' নামে একটি সীমিত স্বায়ত্তশাসিত সরকার গঠিত হয়।
কিন্তু পশ্চিম তীরে অবৈধ ইহুদি বসতি নির্মাণ, জেরুজালেমের মর্যাদা, ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন এবং চূড়ান্ত সীমানা নির্ধারণের মতো মূল বিষয়গুলোর সমাধান না হওয়ায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব দ্বিধাবিভক্ত—পশ্চিম তীরে ফাতাহ-নিয়ন্ত্রিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এবং গাজা উপত্যকায় হামাসের শাসন।
ইসরায়েল কর্তৃক পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ এবং গাজার উপর কঠোর অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
দশকের পর দশক ধরে চলমান এই সংঘাত আজও একটি ন্যায্য ও স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছে।
কখন হবে এর ন্যায্য এবং স্থায়ী সমাধান।
⨳𝗙𝗶𝗻𝗱 𝘂𝘀 𝗼𝗻𝗹𝗶𝗻𝗲⨳
Website ► https://wisdomstorys.blogspot.com/
Facebook page ► https://www.facebook.com/profile.php?id=100067001019554
Wisdom Story ► https://www.youtube.com/@Wisdom_Storys
Peace Islam Tv ► https://www.youtube.com/@Peace_Islam_Tv
Quiz Description ► https://www.youtube.com/@Quiz_Description_666
No comments